September 27, 2026, 3:55 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও বিভিন্ন জেলার একাংশ প্রার্থী নিয়োগপত্র না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। ভেরিফিকেশন বা প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ের পর তাদের নাম নিয়োগপত্রের তালিকায় না থাকায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে নিয়োগপত্রের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন এসব প্রার্থীর একটি অংশ।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে জড়ো হন প্রার্থীরা। পরে বেলা ১১টার দিকে মিছিল নিয়ে শাহবাগ থানার সামনের সড়কে অবস্থান নেন তারা। চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও যারা নিয়োগপত্র পাননি, তাদের দ্রুত নিয়োগপত্র দেওয়ার দাবি জানিয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছেন বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
১৪ হাজার ৩৮৪ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-এর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় গত ৯ জানুয়ারি। পার্বত্য তিন জেলা বাদে দেশের ৬১ জেলায় অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হন। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে নিয়োগের জন্য নির্বাচিত করা হয়।
চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর নিয়োগপত্র পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন নির্বাচিতরা। ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। অনেক প্রার্থী নিয়োগপত্র পেলেও চূড়ান্ত ফলে নাম থাকা সত্ত্বেও একাংশ প্রার্থী নিয়োগপত্র না পাওয়ার কথা জানান। এতে তাদের মধ্যে প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
কতজন বাদ পড়েছেন, নিশ্চিত নয়
নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীর প্রকৃত সংখ্যা এখনো সরকারি কোনো একক হিসাবে প্রকাশ করা হয়নি। প্রার্থীদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের দাবি অনুযায়ী এ সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি থেকে দুই হাজারেরও বেশি হতে পারে। ‘কেন্দ্রীয় প্যানেল প্রাইমারি ২০২৫’সহ কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম প্রায় ১ হাজার ৫০০ বা তার বেশি প্রার্থীর নিয়োগপত্র ইস্যু না হওয়ার দাবি করেছে। আবার আগের বিভিন্ন জেলা-ভিত্তিক তথ্যেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রার্থীর নিয়োগপত্র না পাওয়ার তথ্য এসেছে।
জেলা-ভিত্তিক তথ্যেও ভিন্নতা দেখা গেছে। খুলনায় ২৭৫ জনের জন্য সুপারিশ করা হলেও ২৬৫ জন কাগজপত্র জমা দেন এবং তাদের মধ্যে ১৯৬ জন নিয়োগপত্র পেয়েছেন; ৬৯ জন পাননি। সুনামগঞ্জে ৬১৭ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য সুপারিশ পাঠানো হলেও সর্বশেষ যাচাইয়ে ১২০ জন বাদ পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। মৌলভীবাজারে ৩৪৭ জনের মধ্যে ৬৭ জন এবং যশোরে ২৯০ জনের মধ্যে ১০৬ জন নিয়োগপত্র পাননি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভেরিফিকেশনই মূল প্রশ্ন
এই নিয়োগ জটিলতার কেন্দ্রে রয়েছে পুলিশ ভেরিফিকেশন, এনএসআইয়ের যাচাই এবং অন্যান্য প্রশাসনিক শর্ত। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়োগপত্র জারির আগে প্রার্থীর বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, জাতীয়তা, স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততা এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করার কথা রয়েছে। পুলিশ ভেরিফিকেশন বা এনএসআই প্রতিবেদনে কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য থাকলে তার নিয়োগ আদেশ জারি না করার নির্দেশনাও রয়েছে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য সনদ না থাকা বা নেতিবাচক ডোপ টেস্টের ফল পাওয়া গেলেও নিয়োগপত্র ইস্যু স্থগিত রাখার নির্দেশনা রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত সুপারিশের পরও কোনো প্রার্থীর নিয়োগপত্র আটকে যাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু মেধাতালিকা নয়, নিয়োগের পূর্বশর্তগুলো পূরণ হয়েছে কিনা—সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
তবে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের প্রশ্ন, চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাদের কার ক্ষেত্রে কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে এবং কোন নির্দিষ্ট কারণে নিয়োগপত্র ইস্যু করা হয়নি। এ বিষয়ে প্রত্যেক প্রার্থীর ক্ষেত্রে পৃথকভাবে কারণ জানানো হয়েছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রার্থীদের একটি প্ল্যাটফর্ম বাদ পড়া প্রত্যেকের নথি পুনর্যাচাই এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
সরকারি ব্যাখ্যা কী
এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, নিয়োগপত্র নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ২৬ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১ অক্টোবরের মধ্যে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ কোনো প্রার্থী নিয়োগপত্র না পেলে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র পাঠানো হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে পুলিশি ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে নিয়োগের প্রশাসনিক রোডম্যাপেও বলা হয়েছিল, কোনো প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীর অনুকূলে নিয়োগপত্র জারি করা না হলে কারণ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট তালিকা ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠাতে হবে। নির্বাচিত শিক্ষকদের ১ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদানের কথা রয়েছে এবং ৪ অক্টোবর বিদ্যালয়ভিত্তিক পদায়নের আদেশ জারির কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, নিয়োগপত্র ইস্যুর প্রক্রিয়া একদিকে চলমান থাকলেও অন্যদিকে যেসব প্রার্থীর ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়নি বা বিরূপ তথ্য এসেছে, তাদের বিষয়ে পৃথক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
জেলা থেকে শাহবাগে
নিয়োগপত্র না পাওয়ার বিষয়টি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। খুলনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় প্রার্থীরা এরই মধ্যে অবস্থান ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন।
সুনামগঞ্জে ১২০ জন বাদ পড়ার তথ্য সামনে আসার পর প্রার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। অন্যদিকে খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ অহিদুল আলম বলেছেন, কেউ নিয়োগবঞ্চিত হননি; কেউ আগে, কেউ পরে নিয়োগপত্র পাবেন। বিষয়টি মহাপরিচালকের দপ্তরে জানানো হয়েছে। সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের কর্মকর্তারাও বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর কথা জানিয়েছেন।
সামনে তিনটি প্রশ্ন
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও কতজন নিয়োগপত্র পাননি, প্রত্যেকের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশনে কী তথ্য পাওয়া গেছে এবং পুনর্যাচাইয়ের সুযোগ পেলে কতজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়।
শাহবাগের অবস্থান কর্মসূচি মূলত এই প্রশ্নগুলোর দ্রুত ও স্পষ্ট সমাধানের দাবিকে সামনে এনেছে। প্রার্থীরা চান, তাদের বাদ পড়ার কারণ জানানো হোক এবং প্রয়োজন হলে নথি পুনর্যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া হোক। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের অবস্থান হলো, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভেরিফিকেশন একটি নিয়মিত ধাপ এবং যাদের নিয়োগপত্র এখনো দেওয়া হয়নি, তাদের বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ফলে এখন পরিস্থিতির পরবর্তী ধাপ নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের ভেরিফিকেশন প্রতিবেদন, জেলা পর্যায়ের তালিকা এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর। বিশেষ করে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাদ পড়া প্রার্থীদের কারণসহ তালিকা পাঠানোর নির্দেশনা এবং ১ অক্টোবর যোগদানের সময়সীমা—দুটি তারিখই এ জটিলতার নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।